তোর প্রেমে মাতোয়ারা – সুমি আক্তার (পর্ব ২)
কোর্টরুমের ঘড়ি তখন ৭ মিনিট ২৪ সেকেন্ড পার করেছে। আবরার সেদিন এক কোণে বসে ছিল, মুখে কঠোর গাম্ভীর্য, চোখে ক্ষীণ আগুনের ঝিলিক। তার পাশে বসে থাকা বিশ্বস্ত পি.এ. সানা বুঝতে পারছিল, প্রতিটি টিক-টিকের সাথে তার বসের রাগ যেন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। তবু কিছু বলার সুযোগ নেই – কারণ এটি অফিস নয়, আজকের বিষয়টি ব্যক্তিগত, আরও স্পষ্ট করে বললে পারিবারিক।
ডিভোর্সের দিন
হ্যাঁ, আজ আবরার তার সংসার ভাঙতে এসেছে। এমন এক সংসার, যেটি তার কাছে কাগুজে চুক্তির বাইরে কিছুই ছিল না। এই বিয়ের পেছনে ছিল দাদার ইচ্ছা, পারিবারিক দায়িত্ব, আর অনিচ্ছার বোঝা।
হঠাৎ দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন তার বাবা আদনান শাহরিয়ার ও মা বুশরা বেগম। ছেলের ভ্রু কুঁচকে থাকা মুখে হালকা স্নেহের হাসি ছড়িয়ে গেলো মায়ের ঠোঁটে। স্বামীর হাত ছাড়িয়ে ছেলের পাশে এসে দাঁড়ালেন তিনি।
> “তুমি কষ্ট করে এখানে এলে কেন, মা? সব মিটিয়েই তো বাড়ি ফিরতাম।” – আবরারের গলা এবার নরম।
কিন্তু মায়ের চোখে অসহায়তা। কথা না বলে যেন সব বলছেন তিনি। বাপ-ছেলের মতের অমিল আজও স্পষ্ট। পরিবারে সবাই জানে – আবরারের সিদ্ধান্ত মানেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। কিন্তু আজ সবাই তার বিপক্ষে, এমনকি মা-ও।
কারণ?
আবরার ৩২ বছরের পূর্ণবয়স্ক পুরুষ, আর তার স্ত্রী মাত্র ১৮। বয়সের এই বিশাল ব্যবধানকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি সে। দাদাজানের অসুস্থতার কারণে যে বিয়ে বাধ্যতামূলক হয়েছিল, এখন তিনি সুস্থ, আর আবরার মুক্তি দিতে চায় সেই অচেনা মেয়েটিকে।
মুহূর্তের বদল
কোর্টরুমের দরজা আবারও খুললো। আর মুহূর্তেই থমকে গেলো সব শব্দ, সব গতি।
লাল শাড়িতে সেজে এক তরুণী প্রবেশ করলো। কালো শালের ছায়া, চুলের লুজ খোপা, বেলি ফুলের সুবাস, ঝুমকোর মৃদু ঝংকার – যেন এক অনুপম সৌন্দর্যের আগমন। তার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি যেন সুনিপুণ এক ছবির মতো।
আবরার তাকিয়ে রইল, যেন চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেছে। বুকের ভেতর কেমন যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। আর রমণী? চোখ তুলে দেখতেই মিললো সেই দৃষ্টি – গভীর, অদ্ভুত এক টান।
> “তুমিই আমার বউ…!”
এই কণ্ঠের কম্পন, সেই মুহূর্তের উত্তাপ – সবকিছু যেন কোর্টরুমকে বদলে দিলো। চারপাশের মানুষ স্তব্ধ। মা, বাবা, পি.এ. সানা, এমনকি মেয়েটির বাবা-মা – সবাই নির্বাক।
আবরার ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো। তার ঠোঁটে স্নিগ্ধ হাসি, চোখে অনাবিল মায়া। সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েটির কপালে রেখে দিলো মৃদু চুম্বন।
> “নাম কী তোমার?”
প্রশ্নের উত্তর এলো না। শুধু কাঁপা কাঁপা শরীর আবরারের বুকের ভেতর আশ্রয় নিলো।
আর চারপাশে তখন নিস্তব্ধতা – এক নীরব স্বীকৃতি।
---
চলবে…

No comments:
Post a Comment